শুক্রবার ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৩১ শয্যার জনবলও নেই, খুঁড়িয়ে চলছে ৫০ শয্যার শ্রীপুর হাসপাতাল

জায়দুল কবির ভাঙ্গী, আঞ্চলিক প্রতিনিধি, গাজীপুর :   |   বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   4 বার পঠিত

৩১ শয্যার জনবলও নেই, খুঁড়িয়ে চলছে ৫০ শয্যার শ্রীপুর হাসপাতাল

প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল না থাকায় খুঁড়িয়ে চলছে শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এতে প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর চাপ। রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। ফলে ভোগান্তিতে পড়ছেন চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীরা।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে এসব তথ্য জানা যায়। একই দিনে হাসপাতালটির মাসিক সভাও অনুষ্ঠিত হয়।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, শিল্পনগরী শ্রীপুর উপজেলায় সাড়ে আট লাখ মানুষের একমাত্র সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। মাইগ্রেশনের কারণে আরও প্রায় ১০ লাখ মানুষ এখানে বসবাস করেন। প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। ভাসমান মানুষসহ প্রায় ২৫ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার চাহিদা এই হাসপাতালকে কেন্দ্র করে।

১৯৮১ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে কার্যক্রম শুরু করা হাসপাতালটি ২০১২ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে কাগজে-কলমে শয্যা বাড়লেও জনবল ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা সে অনুযায়ী বাড়েনি। বর্তমানে ৩১ শয্যার জনবল কাঠামো অনুযায়ীও ১২টি মেডিকেল অফিসারসহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ৩৫টি পদ শূন্য রয়েছে। গত ছয় মাস ধরে কনসালটেন্টের তিনটি পদই ফাঁকা। শিশু ও গাইনি কনসালটেন্ট না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে শিশু ও প্রসূতি মায়েদের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা।

চিকিৎসক সংকটের কারণে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে রোগীদের। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন শিশু ও বয়স্ক রোগীরা। ৫০ শয্যার বিপরীতে অতিরিক্ত রোগী ভর্তি থাকায় অনেককেই মেঝে কিংবা বারান্দায় থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

হাসপাতালে একটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও দুই বছর ধরে নেই চালক। জেনারেটর সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় জুনিয়র মেকানিকের একটি পদও এক বছর ধরে শূন্য। পাঁচটি পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সব পদই বর্তমানে খালি। পুরোনো ও জরাজীর্ণ ভবনে ঝুঁকি নিয়ে চলছে টিকাদান কার্যক্রম।

সব মিলিয়ে ১৮ জনকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দিয়ে সেবা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ, টিকাদানসহ নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা চালু থাকলেও জনবল সংকটের কারণে সেবার মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত শূন্য পদে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হলে সেবার মান আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক সূত্র জানায়, বছরে চাহিদার তুলনায় মাত্র ১০ ভাগের এক ভাগ ওষুধ পাওয়া যায়। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও বরাদ্দ পাওয়া যায় না। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০ রোগী এক্স-রে পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে আসেন। অথচ এক্স-রে ফিল্ম বরাদ্দ থাকে মাত্র ২০টি। ফলে বাকি রোগীদের বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।

সহকারী সার্জন ডা. বিজন মালাকার বলেন, “প্রতিদিন জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে ১৫ শতাধিক রোগী আসে। আমরা সর্বোচ্চ দিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছি। জনবল সংকট কাটলে সেবার পরিপূর্ণতা আসবে।”

আমেনা খাতুন নামে এক রোগী বলেন, “আমি পাশের গফরগাঁও উপজেলার বাসিন্দা হলেও শ্রীপুরে ভাড়ায় থাকি। দুই দিন ধরে এই হাসপাতালে ভর্তি আছি। ডাক্তার-নার্সরা আন্তরিক হলেও লোকবল কম থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই এসে চলে যেতে হয়।”

আলম মিয়া নামে আরেক রোগী বলেন, “এখানকার ডাক্তার চারটি পরীক্ষা করতে দিয়েছেন। কিন্তু এক্স-রেসহ দুটি পরীক্ষা বাইরে থেকে করাতে হচ্ছে। কয়েকটি ওষুধও ফার্মেসি থেকে কিনে আনছি।”

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, “নানা সংকটের মধ্যেও রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। তবে দ্রুত শূন্য পদ পূরণ এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানো না হলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যসেবার মান চরমভাবে ব্যাহত হবে।”

তিনি আরও বলেন, “চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবল বৃদ্ধির বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি সমাধান পাওয়া যাবে।”

মাসিক সভায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জনবল সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, “শিক্ষার পাশাপাশি জনগণের স্বাস্থ্যসেবার মান আরও বাড়াতে এ খাতকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়েছেন। অথচ এখানে আট মাস ধরে পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী বরাদ্দ নেই। তাহলে কীভাবে চলবে? এই হাসপাতালে ৩৬টি পদই শূন্য। ইতোমধ্যে আমি এমপি হওয়ার পর হাসপাতালটি ১০১ শয্যায় উন্নীত করার পাশাপাশি জনবল নিয়োগের জন্য ডিও লেটার দিয়েছি।”

তিনি যায়যায়দিনকে আরও বলেন, “স্বাস্থ্য খাতে কোনো ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি মেনে নেওয়া হবে না বলে ইতোমধ্যে সরকার শক্ত অবস্থান নিয়েছে। মন্ত্রীও চেষ্টা করছেন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় স্বাস্থ্যসেবার মান জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সমস্যাগুলো সমাধান হবে।”

Facebook Comments Box

Posted ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

brahmanbaria2usa.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আরিফুর রহমান আরিফ

ARIFUR RAHMAN ARIF ( + 1 203-727-4273)

প্রধান সম্পাদক : হাকিকুল ইসলাম খোকন
সহসম্পাদক : মিম রহমান
নির্বাহী সম্পাদক : সঞ্জিব ভট্টাচার্য
আঞ্চলিক প্রতিনিধি, গাজীপুর অঞ্চল : আলহাজ্ব জায়দুল কবির ভাঙ্গী
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধি : মিনহাজুল আবেদীন পলাশ
বার্তা সম্পাদক : মোহাম্মদ দুলাল মিয়া